রথের ইতিহাস - History of Rath Yatra

রথযাত্রা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় ধর্মীয় উৎসব। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং বিশ্বাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। বিশেষ করে ওড়িশার পুরী শহরের রথযাত্রা বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত, যেখানে লাখো ভক্তের সমাগম ঘটে।
রথের ইতিহাস
বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রথযাত্রা উৎসব উদযাপিত হয়। এই উৎসব মানুষের মধ্যে ভক্তি, ভালোবাসা এবং ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেয়।

রথযাত্রার ইতিহাস

রথ এই একটা ছোট্ট শব্দ শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে তিনজনের প্রতিমূর্তি। আর তারা হলেন জগন্নাথ দেব, বলভদ্র দেব এবং দেবী সুভদ্রা। কিন্তু একটা জিনিস জানলে চমকে যাবেন, মহাভারতে অর্জুনের রথকে রক্ষা করতে স্বয়ং বজরংবলী হনুমান সেই রথের উপরেই অধিষ্ঠিত ছিলেন। এদিকে রামায়ণেও আমরা নানান রথের উল্লেখ পাই; এই যেমন রাবণের পুষ্পক রথ, শ্রীরামকে যুদ্ধে সাহায্য করতে দেবরাজ ইন্দ্রের পাঠানো বৈজয়ন্ত রথ। আসলে এই রথ নামক যানবাহনটার সঙ্গে প্রাচীনকাল থেকেই জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর নাম। আর এটা শুধু ভারতবর্ষে নয়, পৃথিবীর নানান সভ্যতাতেই বারবার এই রথের উল্লেখ হয়েছে।

মেসোপটেমিয়ান সভ্যতার লোকেরা বিশ্বাস করত, সূর্যদেবতা সামাস বা উটু নাকি রথে চড়ে আকাশের একদিক থেকে আরেকদিকে যায় বলেই দিনরাত্রি হয় এবং ঋতু পরিবর্তন হয়। প্রাচীন ইজিপ্টেও ফেরাউদের রথ ব্যবহার করার উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী তাদের সূর্যদেবতা হেলিউস কিন্তু এই রথেই বিরাজমান ছিলেন। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, রথ কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকমভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ভারতবর্ষে এই রথকে বিখ্যাত করেছেন জগন্নাথ দেব।

নমস্কার, আমি সুজয় নীল। পুরীর জগন্নাথ দেবের রথ নিয়ে আগেও আমি একটা ভিডিও বানিয়েছিলাম আমার এই চ্যানেলে। তবে রথযাত্রার এই পূর্ণ লগ্নে আমার আজকের এই ভিডিওতে জগন্নাথ দেবের রথের গল্প তো থাকবেই, কিন্তু তার সঙ্গেই থাকবে মহাভারতে অর্জুনের রথ, রামায়ণে শ্রী রামচন্দ্রের রথ এবং সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন রথের গল্প। এছাড়াও শ্রী চৈতন্যদেবের হাত ধরে কিভাবে বাংলার বুকে রথযাত্রা এতটা জনপ্রিয় হলো এবং আজ থেকে 141 বছর আগে কিভাবে হুগলির মাহে 20 লক্ষ টাকার রথ গড়ে উঠলো, এই সমস্ত কিছু নিয়ে আমরা গল্প করব এই ভিডিওতেই। তাহলে চলুন আর দেরি না করে ঢুকে পড়া যাক সোজা মূল পর্বে।

মানব সভ্যতায় রথের ব্যবহার যে বহু প্রাচীন তার প্রমাণ আমরা বিভিন্ন রকমভাবে পেয়েছি। এই যেমন ধরুন আমাদের হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো সভ্যতা, সেটা তো খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় 3000 বছর আগেকার। এবার সেখানকার মাটিতে কিন্তু চাকা এবং রথের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এছাড়াও হরপ্পা থেকে এমন অনেক ছোট ছোট টেরাকোটার গাড়ির নমুনা পাওয়া গেছে যা দেখলে অনেকটাই বাচ্চাদের খেলার রথ বলে মনে হবে। আচ্ছা, খেলনা রথের কথা না হয় বাদই দিলাম; 2018 সাল নাগাদ ভারতবর্ষের উত্তরপ্রদেশের সানাউলীতে এক ব্যক্তির সমাধিতে এমন একটা রথ পাওয়া গেছে যা 4000 বছরের পুরনো। এছাড়াও আমাদের ভারতবর্ষে মহারাষ্ট্রের দৈমাবাদে তামার তৈরি এই রথের মূর্তিটা আবিষ্কৃত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এরা তাম্র-ব্রোঞ্জ সভ্যতার সময়কালে তৈরি। তবে এগুলো আসলে ছিল ভারী চাকার রথ।

খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় 3500 বছর আগে থেকেই পূর্ব ইউরোপ এবং মেসোপটেমিয়ায় এই ধরনের রথ চলতো। সলিড চাকা এবং ষাঁড়ে টানা এই রথগুলো পাকে আরাম দিলেও জীবনে গতির সঞ্চার করতে পারেনি। দ্রুতগতির রথের প্রথম আবির্ভাব কিন্তু হলো 2000 খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইউরেশিয়ান স্টেপের শিন্তাস্তা-পেত্রবকা সভ্যতায়। বর্তমানে এই জায়গাটা রাশিয়া এবং কাজাখস্তানের অন্তর্গত। ঘোড়াকে পোষ মানিয়ে তাদের এই ধরনের হালকা চাকার রথের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ায় মানব সভ্যতা কিছুদিনের মধ্যেই সাংঘাতিক গতি লাভ করল। আর এই হালকা চাকার রথই ধীরে ধীরে মিশরীয় সভ্যতা, রোমান সভ্যতা এবং চৈনিক সভ্যতার গন্ডি পেরিয়ে সোজা এসে মিশে গেল প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায়।

ধীরে ধীরে রাজ-রাজাদের মধ্যে রথের ব্যবহার বাড়লো। ভারতবর্ষে সেই সময় রথকে সমৃদ্ধি এবং খ্যাতির প্রতীক বলে ধরা হতো। এখানে একটা ছোট্ট ট্রিভিয়া দিয়ে রাখি শিকাগোর জনসভায় ওই বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতায় ফিরে এলেন এসএস মোমবাসা জাহাজে চেপে। জাহাজ নোঙর ফেলল কলকাতার বজবজে। পরেরদিন বজবজ থেকে স্পেশাল ট্রেনে চেপে শিয়ালদাতে এসে নামলেন স্বামীজি। এরপর ওই শিয়ালদা স্টেশন থেকে ঘোড়ায় টানা রথে চাপানো হলো স্বামীজিকে। সেই রথে চড়েই শিয়ালদা ফ্লাইওভার, মহাত্মা গান্ধী রোড এবং হাতিবাগান হয়ে স্বামীজি পৌঁছেছিলেন আলমবাজার মঠে। সেদিন স্বামীজির রথযাত্রা দেখার আশায় রাস্তার ধারে কাতারে কাতারে মানুষ দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এই রথ কিভাবে মিলেমিশে গেল বিভিন্ন দেশের পৌরাণিক কাহিনীতে আর কিভাবেই বা তা হয়ে উঠলো দেবতা এবং যোদ্ধাদের সবচেয়ে প্রিয় বাহন, এবার সেটাই জানবো।

রথের সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির যোগসূত্র সাংঘাতিক রকমের। এই যেমন সূর্যদেবের রথ; বলা হয় সূর্যদেবের এই রথ নাকি সাতটা ঘোড়া মিলে টানতো। কিন্তু কেন সাতটা ঘোড়া? এই সাতটা ঘোড়ার মানে সপ্তাহের সাতটা দিন, রামধনুর সাতটা রং এবং সাতখানা চক্র। তবে আগেই বলেছি, এই রথে চড়া সূর্যদেব যে শুধু আমাদের সংস্কৃতির অংশ এমনটা কিন্তু নয়। মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায় এমনই এক রথে চড়া সূর্যদেবতার কথা জানা যায় যার নাম ছিল সামাস বা উটু। আবার গ্রিক পুরাণেও সূর্যদেবতা হেলিওসের দেখা মেলে রথে।

কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম বিখ্যাত রথটা হলো পুষ্পক রথ। এই পুষ্পক রথটা তৈরি করেছিলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা। বলা হয় এটা নাকি মাটিতে নয়, আকাশে উড়তে সক্ষম ছিল। তাই অনেক সময় এই রথকে পুষ্পক বিমানও বলা হতো। বিশ্বকর্মা এই রথটা বানিয়েছিলেন ব্রহ্মার জন্য। তবে ব্রহ্মা এই রথটা দান করে দিয়েছিলেন কুবেরকে। কুবের ছিলেন যক্ষদের রাজা এবং লঙ্কার আদি অধিপতি; তিনি এই রথে চড়ে স্বর্গ-মর্ত্য ভ্রমণ করতেন। এদিকে রাবণ আবার ছিলেন কুবেরের সৎ ভাই। কুবেরের এত প্রতিপত্তি সহ্য করতে না পেরে তিনি কুবেরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসলেন। সেই যুদ্ধে রাবণের হাতে পরাজিত হলেন কুবের, আর পুষ্পক রথসহ কুবেরের সমস্ত সম্পত্তি চলে গেল রাবণের দখলে। এই পুষ্পক রথে চেপেই সীতাদেবীকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে এসেছিলেন রাবণ।

এরপর শ্রীরামচন্দ্র এবং রাবণের যুদ্ধ সম্পর্কে আমরা কমবেশি সকলেই জানি। কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র যে শ্রীরামচন্দ্রকে যুদ্ধে সাহায্য করার জন্য নিজের রথটা দিয়ে দিয়েছিলেন, এ কথা হয়তো অল্প মানুষেরই জানা। হ্যাঁ, দেবরাজ ইন্দ্র শুধু নিজের রথ নয়, নিজের রথের সারথী মাতালীকেও পাঠিয়েছিলেন শ্রীরামচন্দ্রের কাছে। তারপর সারথী মাতালীর চালানো সেই রথে চেপেই রাবণকে পরাজিত করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। তবে রাবণ বধ এবং লঙ্কা বিজয়ের পর শ্রীরামচন্দ্র কিন্তু এই ইন্দ্রদেবের রথে চেপে অযোধ্যায় ফেরেননি; তিনি অযোধ্যায় ফিরেছিলেন রাবণের দখলে থাকা পুষ্পক রথে চেপেই। আর অযোধ্যায় ফেরার পর শ্রীরামচন্দ্র নিজের হাতে সেই রথ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন কুবেরকে।

এইবার কথা বলি মহাভারতে ব্যবহৃত একটা বিশেষ রথের বিষয়ে, যে রথের সারথী ছিলেন খোদ শ্রীকৃষ্ণ এবং যার ধ্বজাধারী ছিলেন স্বয়ং বজরংবলী হনুমান। হ্যাঁ, কথা বলছি অর্জুনের রথ 'কপিধ্বজ' নিয়ে। এই কপিধ্বজ নামটা এসেছে বজরংবলী হনুমানের থেকেই। তবে হঠাৎ বজরংবলী হনুমান কেন অর্জুনের রথে ধ্বজাধারী হতে গেলেন? এর নেপথ্যে একটা গল্প রয়েছে। ততদিনে শ্রীরামচন্দ্র এবং রাবণের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, শ্রীরাম দেবী সীতাকে নিয়ে অযোধ্যাতেও ফিরে গেছেন। এদিকে মহাভারতে পঞ্চপাণ্ডবরা তখন নির্বাসনে এবং অর্জুন তখন তীর্থযাত্রী হিসেবে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এইভাবেই ঘুরতে ঘুরতে তিনি একদিন গিয়ে পৌঁছলেন রামেশ্বরামে। এখানেই ছিল সেই শিব মন্দির যেটা শ্রীরামচন্দ্র নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন লঙ্কা যাত্রার আগে।

সেই সময় সমুদ্রের কাছাকাছি পৌঁছে রাম সেতু দেখে অর্জুনের মনে একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হলো। তিনি ভাবলেন, শ্রীরামচন্দ্র তো ভগবানেরই একটা রূপ এবং তিনি তিরন্দাজিতে অতীব দক্ষ, তাহলে কেন তিনি সেতু বানানোর জন্য বানর সেনা, কাঠবিড়ালী এবং অন্যান্য পশুদের সাহায্য নিলেন? তিনি তো চাইলেই এটা অনায়াসে নিজের তিরন্দাজির অভিজ্ঞতা দিয়েই বানাতে পারতেন। ঠিক সেই সময় একজন বয়স্ক বানর সেনা সেখানে উপস্থিত হলেন এবং অর্জুনকে জিজ্ঞেস করলেন, "ওদিকে কি দেখছো এতক্ষণ ধরে?" অর্জুন তখন নিজের মনের কথাটা জানালেন বানর সেনাকে। কথাটা শুনেই ওই বয়স্ক বানর সেনা হাসিতে ফেটে পড়লেন আর বললেন, "তির দিয়ে তৈরি সেতু? ধুর! ওই সেতু তো আমি এক পা রাখলেই ভেঙে পড়বে। ওই সেতুর পাথরে প্রভু শ্রীরামের নাম লেখা ছিল বলেই সেতুর কিচ্ছু হয়নি।"

কথাটা শুনে অর্জুন গেলেন প্রচন্ড রেগে। তিনি বললেন, "আমি এক্ষুনি একটা সেতু বানাচ্ছি, দেখি তুমি একা পা রেখে কিভাবে সেতু ভাঙতে পারো।" এরপর নিজের গাণ্ডীব ধনুকের মাধ্যমে চোখের নিমেষে একটা সেতু বানিয়ে ফেললেন অর্জুন। কিন্তু এই বয়স্ক বানর সেনা তার উপর শুধু নিজের লেজটা রাখতেই সেই সেতু ভেঙে পড়ল। এরপর আরো একবার সেতু বানালেন অর্জুন, কিন্তু সেবার ওই বয়স্ক সেনা একটা পা রাখতেই সেতু ভেঙে গেল। অর্জুন এবার প্রবল রেগে গেলেন আর বললেন, "আমি আরো একটা সেতু বানাবো। যদি তুমি সেটাকে ভাঙতে পারো, তাহলে আমি হার স্বীকার করে নিয়ে চিতায় প্রবেশ করব।"

এরপর অর্জুন তৃতীয় সেতুটা যখন বানাতে যাবেন, তখন সেখানে উপস্থিত হলেন এক ব্রাহ্মণ। আর সবটা জানার পর তিনি অর্জুন এবং ওই বানর সেনাকে বললেন, "বিচারক ছাড়া কোন বিচারই সম্পূর্ণ হয় না, তাই এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমি বিচারক হিসেবে রইলাম।" এরপর আর কি, অর্জুন আবার একটা সেতু বানালেন। স্বাভাবিকভাবেই ওই বানর সেনা তাতে পাও রাখলেন, কিন্তু সেতুর কিচ্ছু হলো না। সেই দেখে ওই বয়স্ক বানর সেনা লাফানো শুরু করলেন, তবুও সেতু অক্ষতই রইল। এইবার ওই বানর সেনা রেগেমেগে নিজের আসল রূপ ধারণ করলেন দেখা গেল ওই বয়স্ক বানর সেনা আদতে বজরংবলী হনুমান। কিন্তু হনুমানজি নিজের আসল রূপ ধারণ করেও ওই সেতুটা ভাঙতে পারলেন না। আর ঠিক তখনই ওই ব্রাহ্মণও নিজের আসল রূপ ধারণ করলেন দেখা গেল তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং বিষ্ণুদেব।

এইবার যেহেতু হনুমানজি ছদ্মবেশ ধারণ করে অর্জুনকে প্রায় চিতায় পাঠিয়েই দিচ্ছিলেন, তাই শ্রী বিষ্ণু হনুমানজিকে ওই দুষ্টুমির একটা শাস্তি দিলেন। তিনি আদেশ দিলেন, অর্জুনের যখন সবচেয়ে বড় বিপদ আসন্ন হবে, তখন অর্জুনের মাথার উপরে রক্ষাকবজ হিসেবে হনুমানজিকেই থাকতে হবে। ব্যাস, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যখন অর্জুন নিজের রথ নিয়ে যুদ্ধ করতে নামলেন, হনুমানজি হয়ে গেলেন তার রথের ধ্বজাধারী। এবার খোদ বজরংবলী হনুমান যার রক্ষাকর্তা, তাকে ধ্বংস করার শক্তি আর কার মধ্যেই বা আছে! তবে এখানে একটা ছোট্ট কথা বলে রাখি, এই একই কাহিনী কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে বর্ণিত রয়েছে, তাই সবার সঙ্গে কাহিনীর যে মিল থাকবেই এমনটা কিন্তু নয়। চলুন এবার অন্য রথ নিয়ে কথা বলি জগন্নাথ দেবের রথ।

কথিত আছে, জগন্নাথদেব যে রথে চড়ে নগরভ্রমণে বেরোন, সেই রথটা তাকে উপহার দিয়েছিলেন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র। আবার অনেকে বলেন এই রথের শুধুমাত্র নামকরণই করেছিলেন তিনি। কি সেই নাম? নন্দীঘোষ। এই নন্দীঘোষ রথটা আদতে 832 টা ছোট-বড় কাঠের টুকরো দিয়ে বানানো হয়েছিল। রথের সারথীর নাম দারুক এবং রক্ষকের নাম গরুড়। জগন্নাথ দেবের রথের উচ্চতা সাড়ে 13 মিটার, অর্থাৎ প্রায় 45 ফুট। রথের দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ দুটোই 34 ফুট। নন্দীঘোষে রয়েছে 16 টা চাকা। কথিত আছে, এই 16 টা চাকা মূলত পৃথিবী তৈরির 16 টা উপাদানকে বোঝায়। আবার অনেকে বলে চাঁদ যেহেতু 16 টা কলা পরিক্রমণের মাধ্যমে একটা কালচক্র সম্পন্ন করে, তাই জগন্নাথ দেবের রথের চাকা ওই 16 টা কলারই প্রতীক।

জগন্নাথ দেবের রথে পার্শ্বদেবতা হিসেবে থাকেন নজন দেবতা। তারা হলেন—গোপীকৃষ্ণ, গোবর্ধন, রাম, নারায়ণ, ত্রিবিক্রম, বরাহ, রুদ্র, নৃসিংহ এবং হনুমান। এদের সঙ্গে রথে থাকেন আটজন ধ্যানমগ্ন ঋষি। তারা হলেন নারদ, দেবল, ব্যাসদেব, শুক, পরাশর, বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র এবং মরীচি। লাল এবং হলুদ কাপড়ে মোড়া এই রথের সঙ্গে যুক্ত চারটে কালো ঘোড়ার নাম—শঙ্খ, বলাহক, শ্বেত ও হরিদাক্ষ। জগন্নাথ দেবের রথের ধ্বজার নাম ত্রৈলোক্যমোহিনী, কলসের নাম হিরণ্ময়, রথের নেত্রের নাম তৈলোক্যমোহিনী এবং রথের দড়ির নাম... দাঁড়ান দাঁড়ান, এখানে আবার একটা ছোট্ট ট্রিভিয়া দিই। রথযাত্রা আসলেই অনেককে বলতে শুনেছি, "পুরী যাব জগন্নাথ দেবের রথের দড়ি টানতে।" কিন্তু পুরাণ মতে ওই দড়িটা আসলে কি ছিল জানেন? বিভিন্ন পৌরাণিক শাস্ত্র থেকে জানা যায়, জগন্নাথ দেবের রথের দড়ি হিসেবে একসময় শঙ্খচূড় নামের একটা সাপকে ব্যবহার করা হতো।

এরপর বলি বলভদ্রদেবের রথের কথা। 763 টা ছোট-বড় কাঠের টুকরো দিয়ে তৈরি এই রথের নাম তালধ্বজ। 13.2 মিটার উচ্চতার তালধ্বজ রথে থাকে 14 টা চাকা। রথের ধ্বজার নাম উন্মনী আর দড়ির নাম বাসুকি নাগ। বলভদ্রদেবের রথের সারথীর নাম মাতলী এবং রক্ষক স্বয়ং বাসুদেব। এই রথের নজন পার্শ্বদেবতা হলেন গণেশ, কার্তিক, সর্বমঙ্গলা, প্রলম্ব, হলায়ুধ, মৃত্যুঞ্জয়, নাটেশ্বর, মহেশ্বর এবং শেষদেব। এই রথের চারটে সাদা রঙের ঘোড়ার নাম তীব্র, ঘোর, শ্রম ও দীর্ঘ। রথের সুদর্শন চক্রের পাশে যে দুটো কাকাতুয়া পাখি দেখা যায়, তাদের নাম শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস। বলভদ্রদেবের রথটা সবুজ এবং লাল কাপড় দিয়ে মোড়া থাকে।

বাকি রইল দেবী সুভদ্রার রথের কথা। ৫৯৩ টা ছোট-বড় কাঠের টুকরো দিয়ে বানানো এই রথের নাম দর্পদলন। ১২.৯ মিটার উচ্চতার এই দর্পদলন রথে থাকে ১২ টা চাকা। রথের ধ্বজার নাম নাদম্বিকা এবং রথের দড়ির নাম স্বর্ণচূড় নাগ। দেবী সুভদ্রার এই রথটির সারথী হলেন অর্জুন এবং রক্ষক হলেন জয়দুর্গা। দর্পদলন রথের নজন পার্শ্বদেবীর নাম চণ্ডী, চামুণ্ডা, মঙ্গলা, উগ্রতারা, বনদুর্গা, শূলিদুর্গা, শ্যামাকালী, বিমলা ও বরাহী। খেয়াল করে দেখবেন, দেবী সুভদ্রার রথের চারটি ঘোড়ার রঙই কিন্তু লাল। এই লাল রঙের চারটি ঘোড়ার নাম রোচিকা, মোচিকা, জিতা ও অপরাজিতা। এতো গেল তিন দেবদেবীর রথের কথা। কিন্তু পুরীর এই রথযাত্রা উৎসবটি কিভাবে শুরু হলো আর কিভাবেই বা পুরীর বুকে গড়ে উঠলো জগন্নাথ দেবের মন্দির, চলুন এবার সেটাই জানা যাক।

পুরাণ মতে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর একদিন শ্রীকৃষ্ণ একটা গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেই সময় জরা নামের এক শবর শিকার করতে বেরিয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের রাঙা চরণকে হরিণ ভেবে ভুল করে তীর ছুড়ে বসেন জরা। তীর মারার পরে খানিকটা এগোতেই জরা বুঝতে পারেন তিনি কত বড় সর্বনাশ করে বসে আছেন। তখন সঙ্গে সঙ্গে তিনি গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের পায়ে লুটিয়ে পড়েন এবং সমানে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। কিন্তু তখন শ্রীকৃষ্ণ জরাকে বলেন, নিজের পূর্বজন্মের কর্মফলের জন্যই নাকি শ্রীকৃষ্ণ জরার হাতে নিহত হলেন, এতে জরার কোন দোষ নেই। এরপর ওখানেই দেহ রাখেন শ্রীকৃষ্ণ।

কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের মৃতদেহ সৎকারের সময় অর্জুন দেখলেন, শ্রীকৃষ্ণের গোটা দেহটা পুড়লেও তার হৃদয়টা কিছুতেই পুড়ছে না। ঠিক ওই সময়ই একটা দৈববাণী হলো "এই হৃদয় হলো পরম ব্রহ্ম, তাই এই হৃদয়কে সমুদ্রে নিক্ষেপ করো। সমুদ্রেই ওর অনন্ত শয়ন।" অর্জুন সেই দৈববাণী শুনে শ্রীকৃষ্ণের হৃতপিণ্ডকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিলেন। এরপর শ্রীকৃষ্ণের সেই হৃতপিণ্ড ঢেউয়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে পৌঁছে গেল পুরীতে। জরা নামের সেই শবর দ্বারকা থেকে পুরী অবধি ছুটে গেল শ্রীকৃষ্ণের হৃতপিণ্ডকে অনুসরণ করে। পুরীতে পৌঁছানোর পর জরাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, "কাল ভোরে আমার হৃদয়টাকে জল থেকে তুলে নিও। এখন থেকে তোমার বংশধরদের হাতেই পূজো নেব আমি।" সেই থেকেই শ্রীকৃষ্ণ নীলমাধব রূপে শবরদের হাতে পূজিত হওয়া শুরু করলেন।

কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের নীলমাধব রূপের সঙ্গে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার কি সম্পর্ক? বলছি। পদ্মপুরাণ অনুযায়ী, মালব দেশের সূর্যবংশীয় রাজা মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন বিষ্ণুদেবের পরম ভক্ত। তাই তিনি শ্রীক্ষেত্র অর্থাৎ পুরীতে বিষ্ণুদেবকে স্মরণ করে একটা মন্দির গড়ে তুললেন। কিন্তু শূন্য মন্দিরে তখনো কোন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একদিন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের কানে এলো স্বয়ং বিষ্ণুরই আরেক রূপ নীলমাধবের কথা। রাজা ঠিক করলেন বিষ্ণুর এই রূপকেই তিনি তার মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করবেন। নীলমাধবের বিগ্রহের খোঁজ লাগিয়ে রাজা তখন চারদিকে লোক পাঠালেন। বাকিরা খালি হাতে ফিরলেও একমাত্র রাজপুরোহিত বিদ্যাপতি ফিরে এলেন না।

এদিকে নীলমাধবকে খুঁজতে খুঁজতে বিদ্যাপতি তখন গভীর জঙ্গলে ঢুকে হারিয়ে গেলেন। ওই ঘন জঙ্গল থেকে তাকে উদ্ধার করে নিজের বাড়ি নিয়ে এলেন শবররাজ বিশ্ববসুর কন্যা ললিতা। ললিতাকে দেখে বিদ্যাপতির ভালো লেগে গেল, বিবাহ বন্ধনেও আবদ্ধ হলেন তারা। বিবাহের পর বিদ্যাপতি দেখলেন, তার শ্বশুরমশাই অর্থাৎ শবররাজ বিশ্ববসু রোজ সকাল হলেই স্নান সেরে কোথাও একটা যান। এই নিয়ে ললিতাকে প্রশ্ন করলে বিদ্যাপতি জানতে পারলেন, জঙ্গলের মধ্যে একটা গোপন জায়গায় নীলমাধবের পূজো করতে যান বিশ্ববসু। নীলমাধবের কথা জানতে পেরে আহ্লাদে আটখানা হলেন বিদ্যাপতি, কারণ বিদ্যাপতি বুঝতে পারলেন হারিয়ে গিয়েও একদম ঠিক জায়গাতেই এসেছেন তিনি।

এরপর নীলমাধবকে দর্শন করার জন্য শ্বশুরমশায়ের কাছে জেদ ধরলেন বিদ্যাপতি। কিন্তু শবররাজ প্রথমে রাজি না হলেও পরে তিনি বিদ্যাপতিকে শর্ত দিলেন, জঙ্গলের মধ্যে বিগ্রহ পর্যন্ত তাকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হবে। বিদ্যাপতিও চালাক; জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় যাওয়ার সময় তিনি গোটা রাস্তায় সর্ষের দানা ছড়াতে ছড়াতে গেলেন। এরপর নীলমাধবের মূর্তি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন বিদ্যাপতি। এই ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের রাজসভায় এসে নীলমাধবের কথা জানালেন বিদ্যাপতি। রাজা ছুটলেন তার নীলমাধবকে আনতে। জঙ্গলের মধ্যে সর্ষে গাছ অনুসরণ করে রাজা যখন গন্তব্যে পৌঁছলেন, নীলমাধবের দেখা পেলেন না তিনি। রাজা বুঝলেন ছল-কপটের সাহায্যে নীলমাধবকে পাওয়া যাবে না। তখন রাজা ঠিক করলেন, যতদিন না নীলমাধবের দর্শন পাবেন, ততদিন তিনি আমৃত্যু উপবাস করবেন।

এরপর একদিন রাজার স্বপ্নে হাজির হলেন স্বয়ং নীলমাধব আর স্বপ্নাদেশ দিলেন সমুদ্রের জলে ভেসে আসবে যে নিমকাঠ, সেই কাষ্ঠখণ্ড থেকেই তৈরি হবে বিগ্রহ। পুরাণ মতে, এরপর সত্যি সত্যিই নাকি সমুদ্রের স্রোতে ভেসে এসেছিল নিমকাঠ। এরপর সেই কাঠ দিয়ে মূর্তি তৈরির জন্য কারিগর হিসেবে বিশ্বকর্মা দেবের আগমন, দরজা বন্ধ করে মূর্তি তৈরির কাজ শুরু এবং রানীমার ২১ দিনের আগে দরজা খুলে ফেলার গল্প তো আপনাদের সকলেরই জানা। তবে ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ অনুযায়ী, মূর্তির হাত-পা কিছুই ঠিক করে তৈরি হয়নি দেখে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন সে সময় ভীষণই মুষড়ে পড়েন। ওদিকে কাজে বাধাদানের জন্য রানীও ভীষণ অনুতাপ করতে থাকেন। তখন দেবর্ষি নারদ হাজির হন ইন্দ্রদ্যুম্নের রাজসভায় আর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে বলেন, "এই অর্ধসমাপ্ত মূর্তি পরমেশ্বরের এক স্বীকৃত স্বরূপ। তাই অনুতাপ-অনুশোচনা ত্যাগ করে উৎসবের আয়োজন করো আর নিজের তৈরি মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করো এই মূর্তি।"

এই যে আমরা রথযাত্রা মানে জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ির পথে যাত্রার কথা বলি, এই মাসির বাড়ি কিন্তু রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের স্ত্রী রানী গুণ্ডিচার বাগানবাড়ি। ইন্দ্রদ্যুম্নের হাতেই মহাসমারোহে জগন্নাথ দেবের প্রতিষ্ঠা হয় শ্রীক্ষেত্রের ওই মন্দিরে। সারা বছর ভক্তদের সমাগম লেগেই থাকতো ওখানে। কিন্তু ভগবানের তো ইচ্ছে হয় ভক্তদের মাঝে নেমে এসে তাদের সুখ-দুঃখের কথা শোনার। তাই বছরে একটা দিন জগন্নাথ দেবকে ভক্তদের মাঝে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন। কিন্তু মন্দির থেকে বেরিয়ে কোথায় যাবেন প্রভু আর কিভাবেই বা নিয়ে যাওয়া হবে তাকে? গন্তব্য হিসেবে ঠিক করা হলো রানী গুণ্ডিচার বাগানবাড়ি, আর বাহন হিসেবে দেবরাজ ইন্দ্র নির্ধারণ করলেন নিজের নন্দীঘোষ রথ। ওই শুরু হলো রথযাত্রা।

কিন্তু বলুন তো পুরীর এই উৎসব কিভাবে বাংলায় এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠলো? কিভাবে উৎপত্তি হলো মাহেশ এবং গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রার? আর বাংলার রথযাত্রায় শ্রী চৈতন্যদেবের ভূমিকা বা কতখানি? এইবার সেই সবটা জানবো আমরা।

বাংলার রথযাত্রার সূত্রপাতের কথা বলতে গেলে অবশ্যই যার নামটা সবার আগে উঠে আসবে, তিনি হলেন শ্রী চৈতন্যদেব। হ্যাঁ, শ্রী চৈতন্যদেবের জন্যই আজ থেকে প্রায় ৬৩০ বছর আগেই শুরু হয়েছিল বাংলার সর্বপ্রথম রথযাত্রা উৎসব, যা আজ পরিচিত মাহেশ রথযাত্রা হিসেবে। কিন্তু রথযাত্রা তো ছিল কলিঙ্গের উৎসব, তাহলে সেটা হঠাৎ করে বঙ্গে এলো কিভাবে? এর নেপথ্যে রয়েছে এক জগন্নাথ ভক্তের মনের দুঃখ। সময়টা চতুর্দশ শতক; ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী নামের এক বাঙালি ভক্তের সাধ হলো পুরীর জগন্নাথ দেবকে নিজের হাতে ভোগ নিবেদন করার। মনে আশা নিয়ে তিনি পুরী গেলেন কিন্তু পুরীর পাণ্ডারা তাকে কিছুতেই ভোগ নিবেদন করতে দিলেন না, উল্টে অপমান করলেন।

মনের দুঃখে ধ্রুবানন্দ খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিলেন। ভক্তের এই করুণ অবস্থা দেখে জগন্নাথদেব স্বপ্নে দেখা দিলেন ধ্রুবানন্দকে আর বললেন, "বঙ্গদেশে ভাগীরথী নদীর পাশে মাহেশ নামের একটা গ্রাম রয়েছে, যেখানে আমি তোমার জন্য দারুব্রহ্ম পাঠাবো। ওই দারুব্রহ্ম দিয়েই আমাদের মূর্তি বানিয়ে পূজো করো তুমি। ওই পূজোতেই তোমার হাতে রাধাভোগ গ্রহণ করবো আমি।" ব্যাস, জগন্নাথ দেবের আদেশে ধ্রুবানন্দ চলে এলেন মাহেশে, পেয়ে গেলেন কাঠ আর শুরু করে দিলেন পুজো। এরপর কালের নিয়মে ধ্রুবানন্দ বৃদ্ধ হলেন। তিনি যখন প্রায় মৃত্যুর শয্যায়, তখন নবদ্বীপ থেকে পুরী যাওয়ার পথে শ্রী চৈতন্যদেব এসে হাজির হলেন মাহেশে। ধ্রুবানন্দের অনুরোধে নিজের দ্বাদশ গোপালের পঞ্চম গোপাল কমলাকর পিপলাইকে ওই কুটিরে জগন্নাথ দেবের পূজো করার দায়িত্ব দিলেন চৈতন্যদেব। আর পুরীকে যেহেতু নীলাচল বলা হয়, তাই মাহেশকে তিনি আখ্যা দিলেন 'নবনীলাচল' নামে। এই কমলাকরই মাহেশ রথযাত্রার সূচনা করেছিলেন পুরীর রথযাত্রা দেখে এসে।

ইতিহাসের পাতা উল্টোপাল্টা করলে দেখতে পাবেন, মাহেশের রথযাত্রার ইতিহাসে প্রথম রথ তৈরি করে দিয়েছিলেন এক মোদক, মানে মিষ্টির ব্যবসায়ী। তারপর পেরিয়ে গেল অনেকগুলো বছর, কমলাকরের বংশধররা সামলালেন রথযাত্রার দায়িত্ব। ধীরে ধীরে সারা বাংলায় বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করল মাহেশের এই রথযাত্রা উৎসব। 1754 সালে রথযাত্রা দেখতে এলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হুগলী জেলার দেওয়ান, শ্যামবাজারের বসু পরিবারের কৃষ্ণরাম বসু। পরের বছরই তিনি পাঁচটা চূড়া বিশিষ্ট একটা কাঠের রথ তৈরি করে দিলেন। এরপর 1798 সালে কৃষ্ণরামের ছেলে গুরুপ্রসাদ বসু নটা চূড়া বিশিষ্ট একটা নতুন রথ বানিয়ে দিলেন। কিন্তু 1884 সালে রথযাত্রার দিন বল্লভপুরের গুণ্ডিচা বাটিতে সেই রথটা পুড়ে গেল। তখন বসু পরিবারের কর্তা ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র বসু। ঠিক তার এক বছরের মধ্যে 1885 সালে মাহেশের বুকে এমন একটা রথের চাকা গড়ালো, যা ছিল সেই সময়কালে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রথ। হ্যাঁ, কারণ যে টাকার অংকটা আমি আপনাদের এবার বলব সেটা শুনলে আপনারা চমকে যাবেন।

1885 সাল, মানে আজ থেকে প্রায় 141 বছর আগে ২০ লক্ষ টাকা খরচ করে একটা লোহার রথ বানিয়ে দিয়েছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র বসু। রথটা তৈরি করেছিল মার্টিন বার্ন কোম্পানি। 12 টা চাকা, চারটে তলা, 50 ফুট উচ্চতা এই রথটা লোহার কাঠামোর উপর কাঠ দিয়ে তৈরি। এই রথটার ওজন প্রায় 125 টন, অর্থাৎ প্রায় 1 লক্ষ 25 হাজার কিলোগ্রাম। রথের একতলায় চৈতন্যলীলা, দ্বিতীয় তলায় কৃষ্ণলীলা এবং তৃতীয় তলায় রামলীলা চিত্রিত রয়েছে, আর ঠাকুরের বিগ্রহ বসানো রয়েছে চতুর্থ তলায়। রথের সামনের দিকে রয়েছে তামার দুটো ঘোড়া আর তারই সঙ্গে রয়েছে কাঠের তৈরি সারথী। সেই যে ১৮৮৫ সালে রথটা বানানো হয়েছিল, আজও ওই রথ দিয়েই রথযাত্রা উৎসব পালিত হয় মাহেশে।

এতো গেল মাহেশের রথের গল্প। এবার ছোট্ট করে গুপ্তিপাড়ার রথের গল্পটা বলে দিই। গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রার সূচনা হয়েছিল ১৭৪০ সালের আশপাশে মধুসূদানন্দ, মতান্তরে পীতাম্বরানন্দের হাত ধরে। গুপ্তিপাড়ার এই রথকে জগন্নাথ দেবের রথ না বলে বলা হয় বৃন্দাবন জীউ রথ। ঐতিহ্যপূর্ণ বৃন্দাবনচন্দ্র মঠের পাশে সারা বছরই এই রথটা একটা টিনের খাঁচায় ভরা থাকে। চারতলার রথের উচ্চতা প্রায় ৩৬ ফুট এবং দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ ৩৪ ফুট করে। রথের দিন এখানকার বৃন্দাবন মন্দির থেকে জগন্নাথ দেবরা যাত্রা করেন প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গোসাইগঞ্জ বড়বাজারে মাসির বাড়িতে।

তবে গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রার একটা নিজস্ব বিশেষত্ব রয়েছে যা ভারতবর্ষের আর কোন রথযাত্রায় দেখা যায়না; আর সে বিশেষত্ব কি জানেন? ভাণ্ডার লুট। উল্টোরথের ঠিক আগের দিন অনুষ্ঠিত হয় এই ভাণ্ডার লুট। কি এই ভাণ্ডার লুট? বলছি। উল্টোরথের আগের দিন জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়িতে জগন্নাথ দেবকে বিপুল পরিমাণ প্রসাদ নিবেদন করা হয়। এই প্রসাদের মধ্যে থাকে গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি, লাবড়া, পনিরের তরকারি, বেগুন ভাজা, কুমড়ো ভাজা, পায়েশ, মালপোয়া, ক্ষীর, ছানা, নানা ধরনের মিষ্টি আর ফলমূল। প্রসাদ নিবেদনের পর এখানকার ভাণ্ডার ঘরে প্রায় ৪০০ টারও বেশি মাটির মালসায় সেই প্রসাদ রাখা হয়। প্রত্যেকটা মালসাতে প্রায় পাঁচ কিলো করে প্রসাদ থাকে। দুপুর থেকেই ভক্তরা ভাণ্ডার ঘরের বাইরে ভিড় জমাতে শুরু করেন আর ঠিক বিকেল পাঁচটার সময় এখানকার পুরোহিতরা ভাণ্ডার ঘরের তিনটে দরজা একসঙ্গে খুলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে ভক্তরা ভিতরে ঢুকে প্রসাদ লুট করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই লুটের মধ্যে কোন অপরাধ নেই, আছে যুগের পর যুগ ধরে চলা লৌকিক বিশ্বাস আর উদযাপনের আনন্দ।

আসলে রথযাত্রার আসল উদ্দেশ্যই তো আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া। রথ তো আমরা সকলেই কমবেশি দেখেছি, কিন্তু এই যে রথের চাকায় এত ইতিহাস, এত পৌরাণিক ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে সেটা এই ব্লগ নিয়ে রিসার্চ করার আগে আমি অতটা জানতাম না। তবে যদি কোথাও কোন তথ্যগত ভুল হয়ে থাকে তাহলে জানবেন সেটা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়েছে; আপনি সঠিক তথ্যটা জানলে অবশ্যই কমেন্টে জানাবেন আমাদের। আমার আজকের এই ব্লগটি আমি এখানেই শেষ করছি, দেখা হবে নতুন কোন ব্লগে। ততক্ষণ অব্দি সকলে ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। আর হ্যাঁ, সকলকে রথযাত্রার অনেক অনেক শুভেচ্ছা। জয় জগন্নাথ! এতক্ষণ ব্লগে যা পরলেন তার পুরো ক্রেডিট সুজয় নীল (ইউটিউব চ্যানেল)।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url
AB AKASH
AB AKASH
AB AKASH is a skilled Digital Marketing and Content Writing Expert specializing in driving organic growth through Blog SEO and strategic content creation. With a proven ability to translate complex ideas into compelling, high-ranking web content, AB AKASH helps businesses significantly boost their online visibility and engagement. Currently completing his Honours 4th Year in the Department of English at Rajshahi New Government Degree College.thank you.